সাগর-রুনি হত্যার ৬২তম দিনে ডিবির ব্যর্থতা স্বীকার

0 0

অবশেষে বহুল আলোচিত সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যা মামলার ৬২তম দিনে এসে তদন্তে ব্যর্থতার দায় স্বীকার করেছেন মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) মনিরুল ইসলাম।

আজ বুধবার আদালতে মামলার নথিপত্র নিয়ে হাজির হয়ে তিনি এ দায় স্বীকার করেন। ওই সময় তার সঙ্গে আদালতের তলবে হাজির ছিলেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. রবিউল আলম।

আজ সকাল ১১টা থেকে বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী ও বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেনের বেঞ্চে এ মামলার বিষয়ে শুনানি শুরু হয়।

শুনানির এক পর্যায়ে আদালত মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার মনিরুল ইসলামকে বলেন, ‘আপনি কি এ মামলার তদন্তের বিষয়ে ব্যর্থতা স্বীকার করছেন?’জবাবে ব্যর্থতা স্বীকার করে মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমরা ব্যর্থ।’ এর আগে আদালত ডিসি ডিবি মনিরুলকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘এ ব্যর্থতার দায় কে বহন করবে?’

জবাবে মনিরুল বলেন, ‘তদন্ত প্রক্রিয়ার সঙ্গে আমি সেভাবে জড়িত নই। ঘটনা হলো উত্তরের, আমি দক্ষিণের উপকমিশনার। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মুখপাত্র হিসেবে আমি গণমাধ্যমে কথা বলেছি। তবে আদালতের আদেশের পর আমি গণমাধ্যমে আর কথা বলিনি। ওই আদেশের পর এই মামলার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা আন্তরিকভাবে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন।’

আদালত বলেন, ‘আপনারাতো এ মামলার কোনো কিনারা দেখতে পাচ্ছেন না।’

মনিরুল বলেন, ‘সর্বোচ্চ চেষ্টার পরও আমরা এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো ক্লু খুঁজে বের করতে পারিনি।’

এ সময় আদালত বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট তো দূরে থাক। অনির্দিষ্ট কোনো ক্লুও খুঁজে বের করতে পারেননি। আর সাংবাদিক নিহতের ঘটনায় কোনো কিছু করতে পারেন না কেন? এর কারণ কি আপনাদের ট্রেনিংয়ের ব্যর্থতা?’

জবাবে মনিরুল বলেন, ‘আমরা যেমন তদন্তে প্রযুক্তি ব্যবহার করছি। অপরাধীরাও প্রযুক্তি ব্যবহার করছে।’

এ সময় আদালত বলেন, ‘সাংবাদিক ও আইনজীবী মারা গেলে আমরা তদন্তে গাফিলতি দেখি। আপনারা কি কোনোভাবে সাংবাদিক ও আইনজীবীদের ওপর অসন্তুষ্ট?’

জবাবে মনিরুল বলেন, ‘গত তিন বছরে ঢাকা মহানগরে তিন সাংবাদিক খুনের ঘটনা ঘটেছে। তাদের মধ্যে এনটিভির আশিকুল ইসলাম ও এটিএন বাংলার ক্যামেরাম্যান মিঠু রয়েছেন। যাদের হত্যাকারীদের আমরা দ্রুত ধরতে সক্ষম হয়েছি। এছাড়া সাংবাদিক ফরহাদ খাঁ ও তার স্ত্রীর খুনের ঘটনায় অতি অল্প সময়ের মধ্যে আসামি গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করেছি। শুধু চতুর্থ ঘটনা সাগর-রুনি হত্যায় আমরা এখনো সফল হইনি। যে কোনো লোক খুন হলেই আমরা সমানভাবে চেষ্টা করি। ঢাকা মহানগরের পুলিশের অধীনে সকল মানুষের জীবনের নিরপত্তা বিধান করা আমাদের দায়িত্ব। আমরা সবক্ষেত্রেই সর্বোচ্চ চেষ্টা করি, কিছু ঘটনা ছাড়া। এ ঘটনাও আমরা চেষ্টা করছি।’

এ সময় আদালত বলেন, ‘কিছু না, অনেক ঘটনার ক্ষেত্রে এটা হয়। আর এ ঘটনার ক্লু বের করতে তিন মাসে পারেন নাই। সামনে পারবেন কি-না, এমন আশা করতে পারছি না। বাদী বা সাগার সরওয়ারেরর পরিবার থেকে আসামিদের সন্দেহ করার মতো কোনো তথ্য পাওয়া গেছে?’

জবাবে মনিরুল জানান, ‘রুনি বা সাগরের পরিবার থেকে এ ধরণের কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।’

আদালত বলেন, ‘আমরা ভীষণ ক্ষুব্ধ। দারোয়ান কোনো তথ্য দিতে পেরেছে কি-না।’

মনিরুল বলেন, ‘দারোয়ানকে কয়েকদফা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। কিন্তু কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।’

আদালত বলেন, ‘আপনারতো কোথাও যেতে পারবেন বলে মনে হয় না। পুলিশ যখন খুন হয়, তখনতো বিলম্ব না করেই আসামিদেরকে গ্রেফতার করতে পারেন।’

জবাবে মনিরুল বলেন, ‘সবক্ষেত্রেই আমরা চেষ্টা করি। পুলিশের ক্ষেত্রে কারণটা খুব দ্রুত জানা যায়। তাই বিলম্ব হয় না। তবে এই মামলায় আমরা দৃশ্যমান কারণ খুঁজে পাইনি।’

আদালত বলেন, ‘এভাবে আমরা চলতে দিতে পারি না।’এরপর আদালত আইনজীবী ও সাংবাদিকদের বক্তব্য শুনে মামলার তদন্ত কাজ ডিবি থেকে নিয়ে র‍্যাবের কাছে হস্তান্তরের নির্দেশ দেন।

আদালত পুলিশ কর্মকর্তার উদ্দেশে বলে, “আপনাদের তদন্তের সুবিধার জন্য আমরা সাংবাদিকদের অনুরোধ করেছিলাম, তারা যেন এই ঘটনা নিয়ে উল্টাপাল্টা কোনো প্রতিবেদন না ছাপে। তদন্তের প্রতি ক্ষতিকর বিরোধীদলীয় নেত্রীর মন্তব্যকে আমারা ভীষণভাবে নিন্দা করেছিলাম।

“এত সুবিধার পরও কিছুই করতে পারলেন না। ব্যর্থতার ভার অস্বীকারের কোনো স্কোপ নেই। এই ভার সরকারের ওপর পড়েছে।” “হতাশ করলেন, ভীষণ হতাশ করলেন। গোটা জাতির জন্যই এটা হতাশাজনক,” বলে আদালত।

এছাড়া আদালত মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার মনিরুল ইসলামকে ডেকে বলেন, ‘আমাদের এই আদেশ নামাতে (আদেশের লিখিত অনুলিপি) কয়েকদিন লাগবে। আমরা আদেশ দিয়েছি। আপনি পুলিশের মহাপরিদর্শককে বলে দেবেন, আজই যেন মামলাটি স্থানান্তর করা হয়।

পরে ওই আদালতের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার এবিএম আলতাফ হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘আদালতের এই আদেশের প্রয়োগ তাৎক্ষণিক। বেলা ২টা থেকেই মামলাটির তদন্ত র‌্যাবে স্থানান্তর করার প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে।’

উল্লেখ্য, গত ১১ ফেব্রুয়ারি ভোরে রাজধানীর রাজাবাজারে নিজেদের ভাড়া বাসায় খুন হন মাছারাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার ও তার স্ত্রী এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি।

এ ঘটনায় ‘অজ্ঞাতপরিচয়’ ব্যক্তিদের আসামি করে শেরেবাংলা নগর থানায় একটি হত্যা মামলা হয়। মামলাটি তদন্ত করেছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এ পর্যন্ত পুলিশ কাউকে এ মামলায় গ্রেফতার করতে পারেনি।

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

Shares