সীমান্তে আর কতো হত্যার উৎসব

0 1

ভারত প্রতিদিনই সীমান্তে রক্ত ঝরাচ্ছে। বিএস এফ বাংলাদেশের সীমান্তে হত্যাকান্ড, জবরদখল অনুপ্রবেশ ইত্যাদির যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, পৃথিবীর কোথাও এর নজির নেই। ভারতের আগ্রাসী আচরণের ফলে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত পৃথিবীর সবচে বিপজ্জনক মৃত্যু উপত্যকা। প্রতিদিনই এখানে নৃশংস ঘটনা ঘটছে। গত বছর হত্যা করা হলো ৩১ জন নিরপরাধ মানুষকে। অমানবিক নির্যাতন করা হলো ৬১ জন বাংলাদেশীর উপর এর আগের বছর ৭৪ জনকে মেরে ফেলা হলো।

২০০৯ সালে হত্যা করা হলো ৯৮জন নীরিহ মানুষ। বিগত দশ বছরে সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে হত্যা করা হয়েছে কমপক্ষে ১ হাজার বাংলাদেশীকে, পঙ্গু করেছে কয়েক হাজারকে, গ্রেপ্তারের সম্মুখীন হয়েছেন অসংখ্য বাংলাদেশী। ধরে নিয়ে গুম করা হয়েছে শত শত জনকে। এ ছাড়া বি এস এফ সদস্যরা প্রায়ই বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকে ঘরবাড়ী লুট করছে, গবাদী পশু নিয়ে যাচ্ছে, নানা রকম উৎপীড়ন চালাচ্ছে। সীমান্তে এই সব বর্বরতা চালাচ্ছে বি এস এফ। এটা ভারত সরকারের একটা প্রতিষ্ঠান।

সরকারের প্রচ্ছন্ন সমর্থন ছাড়া বি এস এফের সাধ্য নেই এসব ঘটায়। এসব ঘটানো যদি তার জন্য স্বাভাবিক হতো, তাহলে পাকিস্তান সীমান্তেও অনুরূপ ঘটাতে পারতো। চীন সীমান্তে পারতো। কিংবা শ্রীলঙ্কা অথবা নেপালের সীমান্তে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী রক্তের উৎসবে চালাতে পারতো। কিন্তু সে সব সীমান্তে এমন ঘটনা ঘটছেনা। । বিগত ১০ বছরে কোথাও একটিও হত্যার ঘটনা ঘটেনি। ঘটছে কেবল বাংলাদেশ সীমান্তে?

কেন ঘটছে? এজন্যেই ঘটছে যে ভারত সরকার এমনটি ঘটুক- তা চায়। সে চায় বাংলাদেশকে সব সময় ভয়ের মধ্যে রাখতে। চোখ রাঙিয়ে বাংলাদেশের কাছ থেকে সব ধরণের সুযোগ-সুবিধা উদ্ধার করতে। সে বাংলাদেশকে পানি বঞ্চিত করবে, বাংলাদেশ যেনো ভয়ে টু শব্দটিও না করে। সে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে করিডোর সুবিধা ভোগ করবে।

কেউ যাতে এ নিয়ে মাথা তুলে কথা বলার সাহস না পায়। সে তার সীমানা সম্প্রসারণ করে বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকবে, তিনবিঘা করিডোর ও তালপট্রি দেবেনা, পাদুয়া-রৌমারিকে পুনরায় দখল করবে- বাংলাদেশ যেনো এতে নড়াচড়া না করে। সীমান্তের ভয়ানক অবস্থা দেখে যেনো ভয়ে পাথর হয়ে যায়। এদেশের জনগণ এসব হত্যাতান্ডব দেখতে দেখতে এক সময় হয়তো ভাববে সীমান্তে যা হচ্ছে তা আমাদের ভাগ্যের অংশ। ফলে ভারতের অবৈধ পন্যকেও মনে করবে ভাগ্যের অংশ। নিজেদের বাজার ভারতের পন্যে সয়লাব হোক, নিজেদের উনুনে ইন্ডিয়ার খাদ্য পাক করা হোক- এতে তাদের ক্ষুদ্ধ হবার প্রবণতা থাকবেনা।

ভারতের কৌশলকে কেবল গুলি ও হত্যার মাধ্যমে অনূদিত করছে বিএসএফ। বাংলাদেশের ব্যাপারে ভারতের গৃহিত নীতির একটা চেহারা ফোটে উঠে সীমান্তের ঘটনাগুলোতে। সেই নীতির সারকথা কি? সন্দেহ নেই-আধিপত্যবাদ ও বর্বরতা।

ভারত সরকার কিন্তু কূটনৈতিক ভব্যতার আড়ালে একে ঢেকে রাখতে চায়। তারা এই সব ঘটনাকে বলছে অনাকাঙ্খিত। তারা বলছে এগুলো আর হবেনা। বিগত ২০১০ সালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ইন্ডিয়া গেলেন। সেখান থেকে তিনি এগুলো আর না ঘটার আশ্বাস নিয়ে এলেন। ২০১১ সালে ইন্ডিয়ার প্রাইম মিনিষ্টার বাংলাদেশে এলে তিনি সীমান্তে একতরফা হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করার আশ্বাস দিয়ে গেলেন।

বিগত বছরের জুন মাসে আমাদের প্রধানমন্ত্রী সংসদে বললেন সীমান্তে বাংলাদেশের নাগরিক হত্যা বন্ধ করতে ভারত তাদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন শুরু করেছে। কিন্তু এ ঘোষণার পরেও বি এস এফের গুলি সীমান্তে গর্জে উঠছে আগের মতোই। ঘটছে আগের গতিতেই হত্যাতান্ডব।

সর্বশ্রেষ গত ডিসেম্বরে চাপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার আটরশিয়া গ্রামের হাবিবুর রহমান নামের এক যুবককে যে নিমম নির্যাতন করা হলো, তা তো রোমহর্ষক। ভারতে প্রকাশিত ভিডিও চিত্রে দেখা গেছে বি এস এফ এর জওয়ানরা হাবিবকে হাত-পা বেঁধে বিবস্ত্র করে রাইফেলের বাট ও লাঠি দিয়ে নির্মমভাবে পেটায়। হাবিবের অপরাধ হলো বি এস এফ জওয়ানরা তার কাছে দুই হাজার টাকা, পাঁচটি টর্চলাইট ও একটি মুঠোফোন দাবি করেছিলো। সে তা দিতে পারেনি। ফলে তারা তাকে ধরে নিয়ে যায়। একদফা নির্যাতনের পর সারারাত বেঁধে রাখে। পরদিন ১০ডিসম্বের ভোর শাড়ে চারটার দিকে আবারো নির্যাতন চালায়। তার পরণের লুঙ্গি খুলে ছিঁড়ে দুই ভাগ করে লাঠির সঙ্গে হাত বেঁধে মারধর করে। সাত জওয়ান মিলে রাইফেলের বাট ও লাঠি দিয়ে গোপনাঙ্গ সহ পুরো শরীরে বেধড়ক পেটায়। হাবিব তখন জ্ঞান হারায়। তারা তাকে বাধা অবস্থাতেই সীমান্তের পাশে একটি সরিষা খেতে ফেলে চলে যায়। এই ঘটনার ভিডিও চিত্র প্রকাশ করেছে ভারতের টিভি চ্যানেল এন. ডি. টি.ভি।

সংবাদটি প্রকাশের পরে চারদিকে তোলপাড় শুরু হয়। এ নিয়ে সরব হয়ে উঠে খোদ ভারতের অনেকগুলো মানবাধিকার সংস্থা। যদিও এর আগে বাংলাদেশীদের ধরে নিয়ে পাথর ছুঁড়ে হত্যা, নিতম্বে বিষাক্ত ইঞ্জেকশন দেয়া, স্পর্শকাতর অঙ্গে বৈদ্যুতিক শক দেয়া এবং বিবস্ত্র করে পেট্রোল ঢেলে নির্যাতন করার ঘটনা বিএসএফ ঘটিয়েছে, কিন্তু এ ঘটনা মিডিয়ায় ঢেউ তোলে বেশি।

বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন বললেন- তার সরকার এ ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়েছে। ভারতের অর্থমন্ত্রী প্রনব মুখার্জি বললেন- সীমান্তের ঘটনা ফুলিয়ে-ফাপিয়ে দেখার কোনো মানে হয়না। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ও আসল কথাটি বললেন- আওয়ামীলীগের সেক্রেটারী সৈয়দ আশরাফ। তিনি বললেন- সীমান্তের ঘটনা নিয়ে বাংলাদেশ উদ্বিগ্ন নয়।

সন্দেহ নেই সৈয়দ আশরাফ সরকারের মনের কথাটি বলে দিয়েছেন। এতে জনগণও বুঝে নিলো বি এস এফ আমাদের চাইলেই হত্যা করবে। সরকার আমাদের হয়ে কিছু করবেনা।

এই কিছু না করা আমরা দেখে আসছি বছরের পর বছর। ২০১১ সালে আন্তর্জাতিক আইন লংঘন করে কুড়িগ্রামের সীমান্তে ফেলানী নামের ১৫ বছরের এক কিশোরিকে বি এস এফ হত্যা করে। পাঁচ ঘন্টা তার লাশ কাটাতারে ঝুলিয়ে রেখে তারপর তাকে ভারতে নিয়ে যায়।

ফেলানীর এ লাশ ছিলো সীমান্তে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতীক। সীমান্তে আমাদের সার্বভৌমত্ত লাশ হয়ে যাচ্ছে, কাটাতারে তাকে ঝুলানোর আয়োজন সম্পন্ন হচ্ছে আর আমাদের সরকার ভারত প্রেমে এতোই বিভোর হয়ে আছেন যে- এ নিয়ে তারা উদ্বিগ্নও নয়। বাংলাদেশ সরকার যখন ভারতের হাতে নিজের নাগরিক খুন হলে উদ্বিগ্ন নন, তখন ভারত কেন বাংলাদেশী হত্যার ‘নিরাপদ’ কাজটি করতে উদ্বিগ্ন হবে? সুতরাং আরোও দু:সাহসী হয়ে উঠলো বি এস এফ।

তারা কুমিল্লার গলিয়ারা সীমান্ত থেকে অপহরণ করলো বিজিবি হাবিলদার লুৎফুর রহমানকে। তাকে হয়তো পরের দিন জখমী অবস্থায় উদ্ধার করা গেছে কিন্তু সরকারের গোলামী মানসিকতা প্রকাশ হওয়ায় তার প্রতি জনগণের আস্থা যে হারিয়ে গেলো, একে উদ্ধার করার কোনো শক্তি এ সরকারের নেই। এর পাশাপাশি ইন্ডিয়াকে আশকারা দিয়ে বুকের উপর আরো চেপে বসবার সাহস যোগিয়ে এদেশের সামগ্রিক নিরাপত্তার যে সর্বনাশ করা হয়েছে তা থেকে দেশ ও জাতির উত্তরণ অত্যন্ত সুকঠিন হয়ে উঠলো। এই পরিস্থিতিতে জনগণের সর্বাত্মক সচেতনতা ছাড়া স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের আর কোনো পাহারাদার নেই।

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

Shares